১৫ আগস্ট মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের তীরে আমাদের দল একটি বিশেষ সফর সম্পন্ন করে। আগের দিন হামহাম জলপ্রপাত ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি বনের কঠিন মাঠ জরিপের পর, মাধবকুণ্ডে পৌঁছানোর উদ্দেশ্য ছিল ঝরনার গোপন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও পর্যটন সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা। ভোরবেলায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ার তাজা গন্ধ, পানির স্ফটিকময় ছিটা এবং ঘন সবুজ গাছের ছায়া একত্রে একটি অনন্য পরিবেশ তৈরি করে। এই সফরটি শুধুমাত্র ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহের জন্য নয়, বরং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মাধবকুণ্ড, সিলেট বিভাগের গৌরবপুর উপজেলায় অবস্থিত, দেশের বৃহত্তম জলপ্রপাতগুলোর একটি এবং প্রাচীন কালের থেকে স্থানীয় লোককথায় ‘অন্য জগৎ’ নামে পরিচিত। উচ্চতা প্রায় ২৪ মিটার, প্রবাহের তীব্রতা ঋতু অনুসারে পরিবর্তিত হয় এবং বর্ষাকালে বিশেষভাবে চিত্তাকর্ষক দৃশ্য উপস্থাপন করে। পূর্বে করা জরিপে দেখা গেছে, এই অঞ্চলটি সমৃদ্ধ বায়োডাইভার্সিটি এবং বিরল উদ্ভিদ প্রজাতির আবাসস্থল। তবে অব্যবস্থাপিত পর্যটন সুবিধা, অপর্যাপ্ত সাইনেজ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে পর্যটকদের প্রবাহ সীমিত থাকে। এই পটভূমি বিবেচনা করে, মাধবকুণ্ডের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুনরায় মূল্যায়ন করা জরুরি।
স্থানীয় বন বিভাগ প্রধান শ্রীমতি রেহানা বললেন, ‘মাধবকুণ্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য, একই সঙ্গে পর্যটন সুবিধা উন্নয়ন করে স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব’। গাইবান্ধা জেলার কৃষক ও ব্যবসায়ী রাহিম উদ্দিন জানান, ‘ঝরনার পাশে নতুন হোটেল ও রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠলে আমাদের পণ্য বিক্রির সুযোগ বাড়বে এবং গ্রাম্য অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে’। পর্যটক রোহিত চৌধুরী, যিনি সফরে অংশগ্রহণ করেন, মন্তব্য করেন, ‘ঝরনার গোপন গুহা ও স্ফটিকময় পানির দৃশ্য সত্যিই অন্য জগতের মতো, তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে যায়’। এসব মতামত থেকে স্পষ্ট যে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নের সমন্বয়ই সবার প্রত্যাশা।
অধিকাংশ কর্তৃপক্ষ এখন মাধবকুণ্ডের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। সিলেট জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ যৌথভাবে একটি ‘সুস্থ পর্যটন’ প্রকল্প চালু করেছে, যার মধ্যে নিরাপদ ট্র্যাক নির্মাণ, তথ্য কেন্দ্র স্থাপন এবং জরুরি সেবা ইউনিট গঠন অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন সম্পন্ন করে প্রাকৃতিক সুরক্ষা জোন নির্ধারণের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াবে এবং স্থানীয় পরিচয়কে সমৃদ্ধ করবে। এই পদক্ষেপগুলো মাধবকুণ্ডকে ‘অন্য জগৎ’ থেকে ‘সচল পর্যটন গন্তব্যে’ রূপান্তরিত করার লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত।