খুলনা শহরের পুরনো বাজারে ইন্দ্রমোহন সুইটসের ১৩৬ বছরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি আজও একই রেসিপিতে তৈরি হচ্ছে, যা শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অমূল্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। ১৮৯০ সাল থেকে পাঁচ ধরনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি—রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ, পায়েস এবং লাড্ডু—একই গোপন সূত্রে প্রস্তুত করা হয় এবং প্রতিদিন শত শত গ্রাহকের মুখে আনন্দের স্রোত বয়ে আনে। এই মিষ্টিগুলো শুধুমাত্র স্বাদে নয়, ইতিহাসের গন্ধে ভরপুর, যা খুলনার বাণিজ্যিক ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

ইন্দ্রমোহন সুইটসের প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৯০ সালে হুমায়ূন চৌধুরী, যিনি তখনকার বাজারের চাহিদা মেটাতে স্বাদ ও গুণমানের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি অনন্য রেসিপি তৈরি করেন। রেসিপিটি প্রজন্মের পর প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়ে আজও মূল উপাদান—স্থানীয় দুধ, ঘি, চিনি এবং স্বাভাবিক মশলা—ই ব্যবহার করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টির রূপে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনা হয়েছে, তবে গোপন সূত্রের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পরিবারিক গোপনীয়তা ও কঠোর গুণগত মানদণ্ডের প্রতি অটুট বিশ্বাসের ভূমিকা অপরিসীম।

ইন্দ্রমোহন সুইটসের বর্তমান ব্যবস্থাপনা দল, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠাতার নাতি-নাতনি অন্তর্ভুক্ত, মিষ্টির ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আধুনিক স্বাস্থ্যের মানদণ্ড মেনে চলার পাশাপাশি গ্রাহকের প্রত্যাশা পূরণে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গ্রাহকরা প্রায়ই বলেন, এই মিষ্টির স্বাদে পুরনো সময়ের স্মৃতি জাগ্রত হয় এবং তা শহরের পরিচয়কে সমৃদ্ধ করে। স্থানীয় সংস্কৃতি গবেষক ড. রশিদ হক উল্লেখ করেন, ইন্দ্রমোহন সুইটসের মিষ্টি খুলনার সামাজিক সমাবেশ, বিয়ে ও উৎসবে অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে এবং পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়িয়ে শহরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।

খুলনা পৌরসভা ও সংস্কৃতি অধিদপ্তর এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি শিল্পকে সংরক্ষণে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি বাজারে আধুনিক স্যানিটেশন মানদণ্ড প্রয়োগের জন্য নতুন নিয়মাবলী জারি করা হয়েছে এবং ইন্দ্রমোহন সুইটসকে ঐতিহ্যবাহী শিল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারী সহায়তা হিসেবে ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম আপডেটের সুযোগ প্রদান করা হবে। ভবিষ্যতে এই মিষ্টি শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি দেওয়ার জন্য এক্সপোর্ট সম্ভাবনা ও ব্র্যান্ডিং পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে, যা খুলনার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরবে।