ইউনিসেফের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রকাশে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শিশু‑কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় অপুষ্টির প্রধান রূপ ছিল কম ওজন, কিন্তু এখন কম ওজনের তুলনায় অতিরিক্ত ওজনের শিকার শিশু‑কিশোরের সংখ্যা দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই পরিবর্তন কেবল স্বাস্থ্যসেবার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা ও উৎপাদনশীলতাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। তাই সরকার, পিতামাতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একত্রে পদক্ষেপ নিতে হবে।

অতীত দশকে বাংলাদেশে অপুষ্টি মূলত খাদ্য ঘাটতি, রোগ‑সংক্রমণ এবং দরিদ্রতার ফলে দেখা দিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নগরায়ণ, মধ্যবিত্তের বৃদ্ধি এবং দ্রুত পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাসের ফলে প্যাকেটেড খাবার, ফাস্ট‑ফুড ও চিনি‑যুক্ত পানীয়ের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে শারীরিক ক্রিয়াকলাপের সুযোগ কমে গিয়েছে; স্কুলে দীর্ঘ সময় বসে পড়াশোনা, গৃহে টেলিভিশন ও মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। ফলে শিশু‑কিশোরদের দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে, ব্যায়ামের ঘাটতি সঙ্গে সঙ্গে স্থূলতার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

ইউনিসেফের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেছেন, “শিশু‑কিশোরদের স্থূলতা একটি দীর্ঘমেয়াদী জনস্বাস্থ্য সংকট, যা কেবল ওজন নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।” স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখ্য সচিবও এ বিষয়ে সতর্কতা প্রকাশ করে বলেছেন, “শিশুদের স্বাস্থ্যের সঠিক দিকনির্দেশনা না দিলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মানবসম্পদে ক্ষতি হবে।” পিতামাতা ও শিক্ষকগণও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “বাজারে সহজলভ্য উচ্চ ক্যালোরি খাবার ও কম শারীরিক ক্রিয়াকলাপের ফলে আমাদের সন্তানদের স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।” সমাজের বিভিন্ন স্তরে এই সমস্যার ব্যাপকতা স্বীকার করা হচ্ছে এবং সমাধানের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা দাবি করা হচ্ছে।

সরকার ইতিমধ্যে জাতীয় স্তরে শিশু‑কিশোরদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে নীতি প্রণয়ন করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুলে দৈনিক শারীরিক শিক্ষা ঘন্টা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর খাবার সরবরাহ এবং পুষ্টি শিক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শিশুদের জন্য ওজন নিয়ন্ত্রণ ক্লিনিক স্থাপন, পিতামাতাকে সঠিক পুষ্টি জ্ঞান প্রদান এবং সম্প্রদায় ভিত্তিক ব্যায়াম কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগগুলোকে শক্তিশালী করে, মিডিয়া ও এনজিওদের সহযোগিতায় সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর খাবারের মূল্য হ্রাস এবং শারীরিক কার্যকলাপের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থূলতার প্রবণতা উল্টে দেওয়া সম্ভব হবে।"