আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের সঙ্গে বিশেষ প্রতিবেদক নজরুল ইসলামের প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারে পুলিশ সংস্থার জন‑আস্থার হ্রাসকে সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা ক্রমবর্ধমানভাবে জনমতকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই সাক্ষাৎকারে ফকির সাহেব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘পুলিশের মূল কাজ হল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তবে তা অর্জনের জন্য জন‑আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য’। তাই, বর্তমান সময়ে পুলিশ সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা জরুরি, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য মৌলিক শর্ত।
পুলিশ সংস্কারের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত দশকে বহুবার মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা পুলিশ বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গৃহহিংসা এবং গৃহবন্দি সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে ধরেছে। এছাড়া, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্থার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগের ফলে পুলিশকে ‘রাজনৈতিক সরঞ্জাম’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা জন‑আস্থার ক্ষয় ঘটিয়েছে। পূর্বে গৃহীত কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, যেমন আধুনিক প্রশিক্ষণ, মানবাধিকার সংবেদনশীলতা কর্মশালা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, যদিও কিছু অগ্রগতি এনেছে, তবু বাস্তবায়নের ঘাটতি ও তদারকি দুর্বলতার কারণে ফলাফল সীমিত রয়ে গেছে।
সাক্ষাৎকারে ফকির সাহেব উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা এখনো সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারিনি, তবে আমরা ধাপে ধাপে উন্নতি করছি’। তিনি মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সংলাপ বাড়ানোর, অভিযোগ প্রক্রিয়া দ্রুততর করার এবং স্বাধীন তদারকি কমিটিকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠী ও সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া মিশ্র; কিছু গোষ্ঠী পুলিশ সংস্কারের প্রতি আশাবাদী, আবার অন্যরা এখনও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে। বিশেষ করে যুবক ও নারীর অধিকার সংরক্ষণে পুলিশকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে, এ বিষয়ে নারী অধিকার সংস্থার তীব্র আহ্বান শোনা যাচ্ছে। জনমত জরিপে দেখা যায়, পুলিশ প্রতি আস্থা ৪৫% থেকে ৩২% এ নেমে এসেছে, যা সরকারকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে।
কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রথমত, আইজিপি নতুন ‘জন‑আস্থা গঠন’ কর্মসূচি চালু করেছেন, যার মধ্যে স্বচ্ছ নিয়োগ, বাহ্যিক তদারকি কমিটি এবং মানবাধিকার প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়ত, অভিযোগের দ্রুত সমাধানের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নাগরিকরা সরাসরি অভিযোগ দাখিল করতে পারবেন এবং তা ট্র্যাক করতে পারবেন। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধে ‘স্বাধীন নিয়োগ কমিশন’ গঠন করা হয়েছে, যা সকল উচ্চপদস্থ পদে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করবে। ভবিষ্যতে, পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন ডেটা‑ভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং কমিউনিটি পলিসিং মডেল গ্রহণের মাধ্যমে জন‑আস্থার পুনর্গঠন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ধারাবাহিক সংস্কার যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষায় পুলিশকে পুনরায় বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।