২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে বিদেশি ঋণের মোট বকেয়া ১১,৩৪৩ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে বলে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক ডেট রিপোর্ট ২০২৬ প্রকাশ করেছে। এটি গত দশ বছরে বকেয়া ঋণের পরিমাণের তিনগুণ বৃদ্ধি, যেখানে ২০১৫ সালে একই সময়ে ঋণ মাত্র ৩,৭৮৯ কোটি ডলার ছিল। এই অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা, মুদ্রা রিজার্ভ এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। সরকারকে তাত্ক্ষণিকভাবে ঋণ ব্যবস্থাপনা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে, নতুবা ঋণ সেবা খরচের বৃদ্ধি বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ মূলত অবকাঠামো উন্নয়ন, শক্তি প্রকল্প এবং রপ্তানি-ভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণের জন্য গৃহীত হয়েছে। গত দশকে চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ের অধীনে চীনের সঙ্গে সম্পাদিত বৃহৎ প্রকল্পগুলো, যেমন হাই‑স্মার্ট সিটি, রেলওয়ে সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প, ঋণ পরিমাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। একই সঙ্গে, বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি এবং মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা দেশের ঋণ সেবা খরচকে তীব্রভাবে বাড়িয়ে তুলেছে, যা আর্থিক ঘাটতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান মন্ত্রী শফিকুল ইসলাম ঋণের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানিয়ে বলেছেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন এবং দেশের দ্রুত বর্ধমান অবকাঠামো চাহিদা আমাদেরকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণে বাধ্য করেছে, তবে আমরা ঋণ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছি’। বিরোধী দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়ই ঋণ বৃদ্ধির প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে, বিশেষত ঋণ সেবা খরচের বর্ধন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর আর্থিক বোঝা বাড়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করেছে। স্বতন্ত্র অর্থনীতিবিদরা ঋণ বৃদ্ধিকে ‘দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা’ প্রশ্নের মুখে রেখেছেন এবং সরকারকে রপ্তানি বৃদ্ধি, করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে ঘাটতি কমাতে আহ্বান জানিয়েছেন। সাধারণ জনগণের মধ্যেও ঋণ বৃদ্ধির খবর শোনা মাত্রই মুদ্রা অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের স্রোত দেখা দিয়েছে।

সরকার ইতিমধ্যে ‘ঋণ টেকসইতা পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করেছে, যার মূল লক্ষ্য ঋণ‑সেবা অনুপাতকে ৪০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা এবং নতুন ঋণ গ্রহণে কঠোর শর্ত আরোপ করা। তদুপরি, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠন আলোচনার সূচনা হয়েছে, যেখানে সুদের হার হ্রাস এবং মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বাজেট ২০২৪-২৫-এ রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে কর সংস্কার, ডিজিটাল সেবা ও সম্পদ রেজিস্ট্রেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে, সরকার রপ্তানি ভিত্তিক শিল্পের প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করে এবং বৈদ্যুতিক শক্তি, লজিস্টিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ঋণ নির্ভরতা কমাতে চায়। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের ঋণ বোঝা হ্রাস পাবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার হবে।