ভারতের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী গতকাল রাত ১০টায় নিউ দিল্লির একটি হাসপাতালের কক্ষ থেকে নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর অকাল মৃত্যুর সংবাদ দেশজুড়ে শোকের স্রোত তৈরি করেছে। চৌধুরী শুধুমাত্র শিল্পের ক্ষেত্রেই নয়, রাজনীতি ও সমাজের নানা অসংগতি উন্মোচনকারী ব্যঙ্গাত্মক চিত্রের মাধ্যমে জনমনের গভীরতর প্রশ্ন তুলতে সক্ষম এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর সৃষ্টিকর্মে ভারতীয় এবং ইউরোপীয় শিল্প আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট, যা পাঠক ও সমালোচকদের মধ্যে সমানভাবে প্রশংসা পায়। মৃত্যুর মুহূর্তে তাঁর বয়স ছিল ৭২ বছর, এবং তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারধারী ছিলেন।
চৌধুরীর শিল্পজীবন শুরু হয় ১৯৭০ দশকে, যখন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রশিল্প বিভাগে ভর্তি হন এবং তৎকালীন রাজনৈতিক অশান্তি পর্যবেক্ষণ করে প্রথম ব্যঙ্গাত্মক রূপরেখা গঠন করেন। এরপর তিনি ‘দ্য হিন্দু’ এবং ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ সহ বহু প্রখ্যাত পত্রিকায় নিয়মিত রঙিন চিত্র প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি সরকারের নীতি, দুর্নীতি এবং সামাজিক বৈষম্যকে তীক্ষ্ণ তীক্ষ্ণ রূপে উপস্থাপন করতেন। ইউরোপের আধুনিকতাবাদী প্রবাহ, বিশেষ করে জার্মান এক্সপ্রেশনিজম এবং ফরাসি সুররিয়ালিজমের প্রভাব তাঁর রঙের ব্যবহার, রেখা এবং রূপে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এই সংমিশ্রণ তাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি এনে দেয় এবং বহু আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে তার কাজ প্রদর্শিত হয়।
চৌধুরীর মৃত্যুর পর দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শিল্প সমিতি এবং সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে শোকসংকেতের তরঙ্গ বয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শোকবাণী প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতির সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরের ক্ষতি আমাদের সকলের জন্য এক বড় ক্ষতি’। বাংলাদেশের শিল্প সমিতি সভাপতি বলেন, ‘তাঁর ব্যঙ্গাত্মক চিত্রকলা আমাদের সমাজের অন্ধকার কোণগুলোকে আলোকিত করেছে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন’। সামাজিক মিডিয়ায় লক্ষাধিক ব্যবহারকারী তাঁর স্মৃতিতে সমবেত হয়ে ছবি ও মন্তব্য শেয়ার করেছেন, যেখানে বহু তরুণ শিল্পী তাঁর কাজকে অনুকরণ করে নতুন সৃষ্টিতে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।
চৌধুরীর পরিবার ও নিকটস্থ শিল্প সংস্থা একত্রে একটি স্মারক গ্যালারি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যেখানে তাঁর সৃষ্টিকর্মের মূল সংগ্রহ এবং জীবনীমূলক তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। ভারত সরকারও তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পোস্টমার্টেমে জাতীয় পুরস্কার প্রদান করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি, শিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যঙ্গাত্মক চিত্রশিল্পের পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ শিল্পীরা সামাজিক সমালোচনার শক্তি বুঝতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো চৌধুরীর শিল্পী হিসেবে স্থায়ী উত্তরাধিকার গড়ে তুলতে সহায়ক হবে এবং দেশের সাংস্কৃতিক দৃশ্যকে সমৃদ্ধ করবে।